নয়ন এক মনে মাঞ্জার কাঁচ গুড়ো করছিল, হামানদিস্তা দিয়ে। হামানদিস্তাটা সে বড় কষ্ট করে জোগাড় করেছে—মা দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবেনা, তাই সে রান্না ঘর থেকে ওটি হাতিয়ে নিয়ে চুপি চুপি সোজা বাগানে পালিয়ে এসেছে।
কাচ ভাঁঙা গুলো জোগাড় করেছে পেমু। দুটো ফিউজ হয়ে যাওয়া বাল্ব, আর একটি ভাঙা টিউব লাইট। সে এক মনে নয়নের গুঁড়ো করা কাঁচ গুলো মিহি কাপড়ের চালুনি দিয়ে চেলে রাখছিল।
নয়নের বয়স সবে দশ—ক্লাস ফাইভে পড়ে। পড়াশুনায় সে মন্দ নয় তেমন ।শক্ত শক্ত অঙ্ক গুলো সে ভালোই করতে পারে। কিন্তু তার মুন্সিয়ানা অন্যখানে—ঘুড়ি বানানোয়। ঘুড়িই তার একমাত্র নেশা—ঘুমে জাগরনে সারাদিন সে ঘুড়িতে মগ্ন হয়ে থাকে। স্কুলে টিফিনের জন্য মা যে কয়টি টাকা দেয় তাকে, তা থেকে বাঁচিয়ে সে রঙিন কাগজ কেনে। সেই কাগজ দিয়ে, মাথা খাটিয়ে সে নানা রকম ঘুড়ি বানায়। কেনা ঘুড়ি তার পছন্দ নয়। এই ঘুড়ি বানানো নিয়ে সে বাড়িতে কম মারধোর খায়না! এই তো গত ইউনিট টেস্টের সময়ই, বাবা তার সবকটি ঘুড়ি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। মায় কাগজ কাটার ছুরি কাঁচি পর্যন্ত আটকে রেখেছিলেন পরীক্ষা শেষ না হওয়া অবধি।
তবে এসব কিছু তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না! পরীক্ষা শেষ হতেই সে নতুন উদ্যমে ঘুড়ি নিয়ে লেগে পড়েছে। কারন সামনেই বিশ্বকর্মা পুজো। তদের পাড়ার ক্লাব জাগরনী সংঘে প্রতি বছর বিশ্বর্কমা পুজোর পরদিন ঘুড়ি ওড়াবার প্রতিযোগিতা হয়। যার ঘুড়ি সবথেকে বেশী অন্যের ঘুড়ি কাটতে পারবে সেই হবে বিজয়ী। এতদিন সে ছোট ছিল বলে এতে নাম দিতে পারেনি। খেলার সময় মুখ মচকে তাকে বসে থাকতে হয়েছে বড় মাঠের ধারে। এবার সে ক্লাবের দাদাদের অনেক ধরে করে রাজি করিয়েছে। কিন্তু একটা ভয় থেকেই যায়। ছোটকা আবার ওই ক্লাবের সেক্রেটারি, শেষ মূহুর্তে বেঁকে বসলেই চিত্তির। তাই সে ছোটকাকাকে খুব একটা চটাচ্ছেনা! যা পড়া দিচ্ছে চট্ পট্ তা তৈরী করে ছোটকার মন যুগিয়ে রেখেছে।
তা সত্বেও আর একটা চিন্তায় সে কিছুটা মুষড়ে আছে। তা মাঞ্জা নিয়ে। এতদিন ছোটদের সঙ্গে ঘুড়ি কাটা কাটিতে তার মাঞ্জা ভালোই উতরে গেছে। কিন্তু এবার বড়দের সঙ্গে সে কি পেরে উঠবে! এই ভাবনায় তার ঘুম হয়না ক’দিন ভালো করে।
গতকাল দুপুরে এসব ভাবতে ভাবতেই সে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাগানে! অবশ্য বাগান বলতে তেমন কিছু নয়, বাড়ির পিছন দিকের কয়েক কাঠা পতিত জমিতে কিছু ফল, ফুলের গাছ ও কিছু আপন মনের আগাছা গজিয়ে উঠে নয়নের জন্য খেলার আস্তানা বানিয়ে দিয়েছে। একটি বড় জবাফুলের গাছে কিছু ডাল ছেঁটে দিয়ে একটা বসার মতো জায়গা বানিয়েছে নয়ন। সেটা তার সিংহাসন। ‘মহাভারত মহাভারত’ খেলার সময় নয়ন রাজা হয়ে সেখানে বসে।
সেই সিংহাসনে বসে থাকতে থাকতেই সে ঘুড়িটা দেখতে পায়। জামরুল গাছের একেবারে মগডালে, আটকা পরে আছে। পেটকাঠি, হলদে, সবুজ রঙ। নয়ন ঘুড়িটা দেখে অবাক হয়। এখন ঘুড়ি ওড়ানোর সিজন নয় তেমন—অবশ্য নয়ন সারা বছরই ঘুড়ি ওড়ায়। কিন্তু ওটাতো অন্য কারো ঘুড়ি। নয়ন অন্য কারো ঘুড়ি ওড়ায় না। সে প্রথমে ভাবল পেমুকে ডেকে ঘুড়িটা দিয়ে দেবে। তারপর কি ভেবে সে নিজেই গাছে উঠে পড়ে। একেবারে একটা সরু ডালের পাতায় আটকে ছিল ঘুড়িটা! সরু ডাল বেয়ে ঘুড়িটা পেড়ে নিয়ে নামতে গিয়েই বিপত্তি। সরু ডাল ভেঙে একেবারে মাটিতে পপাত চ। কিন্তু পড়ে গিয়ে তার মাথাটা একেবারে ভন্ডুল হয়ে গেল। অবাক হয়ে সে দেখল কোথাও তার এতটুকু ও চোট লাগেনি, তার মনে হচ্ছিল যেন কেউ তার হাত ধরে তাকে শূন্যে চাগিয়ে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে। ঘুড়িটিও একে বারে অক্ষত, নতুনের মতো। সে ঘুড়িটাকে যত্ন করে তার শোবার ঘরের আলমারির পিছনে লুকিয়ে রাখল।
রাত্রিরে শুয়ে শুয়ে সে স্বপ্ন দেখছে—মাঠে মাঠে বিশাল হৈ চৈ—সারা মাঠে অনেক লোকজন,তাদের সবার হাতে হাতে লাটাই। সবাই লাটাইটাকে সাইকেলের হাতল ধরার মতো করে ধরে আছে—ভাসছে তারা ঘুড়ির সঙ্গে ঘুড়ির মতো, হাওয়ায় লাটাই ধরে। নয়নও তাদের সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে, হঠাৎ দমকা এক বাতাসে সে এক জামরুল গাছে আটকা পড়ে গিয়েছে। কোনক্রমে হাঁচড় পাঁচড় করে ডালপালা সরিয়ে মুক্ত হবে নয়ন, তখনই ঘুম ভেঙে যায় তার। ঘুম ভেঙে যেতেই নতুন মাঞ্জার আইডিয়াটা মাথায় আসে তার! প্রতিবছর ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতায় জেতে লাটুর দাদা, বিট্টুদা; তার ইয়া বড় লাটাই, বিশাল শক্ত মাঞ্জা । বিট্টুদা কে একদম সহ্য করতে পারে না নয়ন! গতবার পুজোর সময় অকারনেই সবার সামনে তার মাথায় চাঁটা মেরে অনেক অপমান করেছিল তাকে। এবার তার সুদে আসলে বদলা নেবে নয়ন। এই ভাবনাতেই ভোর রাতের পর আর ঘুম আসেনা তার।
সকাল থেকেই তাই সে লেগে পড়েছে মাঞ্জা বানাতে।সঙ্গী পেমু—একান্ত বশংবদ নয়নের। মাঞ্জা ছাড়াও আরো কয়েকটি ঘুড়ি বানাবে সে। প্রতিযোগিতার নিয়ম আছে পাঁচটির বেশী ঘুড়ি নেওয়া যাবে না। পাঁচটি শেষ হয়ে গেলে, তার দৌড় সেখানেই শেষ করতে হবে!
গাছ থেকে পাওয়া ঘুড়িটা সে ভেবেছিল নেবে না, কিন্তু—কি ভেবে কে জানে সে ঠিক করেছে ঐ ঘুড়িটা নেবে। ঘুড়িটাতে একটা সুন্দর লেজ লাগিয়ে নিয়েছে সে।
মাঞ্জার মশলা তৈরী হয়ে গেলে কদিন ধরে সে খুব বায়না করল, বাবার কাছে, মার কাছে—একটা ভালো বড়ো লাটাই কিনে দেবার জন্যে; কিন্তু এ ব্যাপারে কেউই তাকে বেশী পাত্তা দেয়না—পাছে নতুন লাটাই পেয়ে পড়াশুনা একেবারে চড়কের গাছে তুলে দেয় সে! আবার বেশী বায়না করতেও সাহস পায়না, ছোটকার কাছে কথাটা গেলে, সব প্ল্যান বানচাল হয়ে যায়—এই ভয়ে।
টিফিনের পয়সা যা জমেছিল তা দিয়ে বেশ অনেকটা সুতো হয়ে যায়! এবার সে সবথেকে দামী সুতোটা কিনেছে! তারপর এক রবিবার সারা দুপুর সে আর পেমু মাঞ্জা লাগালো সুতোয়। দেখতে দেখতে বিশ্বকর্মা পুজো এসে গেলো—আগের দিন উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হলনা নয়নের। প্রথমে ছোটকা শুনে একটু বেঁকে বসেছিল কিন্তু নয়ন অনেক অনুনয় বিনয় করে রাজি করিয়েছে।
দুপুর দুপরই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। জাগরনী সংঘের মাঠে লোক থই থই।
প্রথমদিকে নয়ন ভালোই লড়ছিল, তার নতুন মাঞ্জা বেশ কাজে লাগছে, পট পট করে বেশ কয়েকটা ঘুড়ি কেটে দিল সে। কিন্তু বিট্টুদা ওদিকে অপরাজেয়। তার সামনে এবার পড়ল নয়নের ঘুড়ি। কিছু লড়াই করার আগেই পর পর দুটো ঘুড়ি ভো-কাট্টা হয়ে গেল নয়নের। আগে একটি গিয়েছিল। এই দুটো নিয়ে তিনটে হল। চার নম্বর ঘুড়িটা নিয়ে সে কিছুটা লড়াই দিল, কিন্তু পেরে উঠল না। ঘুড়ি ওড়ানোর টেকনোলজিতে বিট্টুদা একেবারে মাস্টার লোক। প্রথমে সুতো ছাড়তে ছাড়তে হঠাত্ দুম করে উপর দিয়ে গোঁত্তা খাইয়ে পেঁচিয়ে কেটে দিল নয়নের ঘুড়ি। নয়ন এবার মুষড়ে পড়ল। তার খুব রাগ হচ্ছিল—কান্না পাচ্ছিল! কোনক্রমে দাঁতে দাঁত চেপে কুড়িয়ে পাওয়া ঘুড়িটায় সে সুতো লাগায়। সুতো লাগিয়ে একটু ওড়াতেই তার হাতে যেন বিজলি খেলে গেল। ঘুড়ি যেন সে ওড়াচ্ছেনা—ঘুড়ি নিজেই উড়ছে। ফর ফর করে তার হলদে লেজ পাখির লেজের মতো দুলছে। নয়ন শুধু লাটাইয়ের হাতলটা আলতো করে ধরে আছে। ঘুড়ি পাখির মতো—চিলের মতো ছোঁ মেরে, গোঁত্তা মেরে উড়ে বেড়াচ্ছে সারা আকাশময়। কি যে হচ্ছে নয়ন কিছু বুঝতে পারছে না, তার মাথা একেবারে ভন্ডুল হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে নয়নের একটু ভয় ভয় করছিল পরে ভয়টা কেটে যেতেই তার মেজাজ হাওয়া ভরা বেলুনের মতো হয়ে যায়। সেও যেন ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে বেড়াচ্ছে! বিট্টুদার ঘুড়ি কোনো পাত্তাই পায় না। পর পর তিনখানা বিট্টুদার ঘুড়ি কেটে দিল নয়ন! নয়ন তখনই মনে মনে ঘুড়িটার নাম দিয়ে দিয়েছে—‘পক্ষীরাজ’! বিট্টুদার চার নাম্বার ঘুড়িটার সাথে পক্ষীরাজ যেন দেয়ালা করছে! সে নিজের খেয়ালে বিট্টুদার সাথে মজা করে যাচ্ছে। নয়ন শুধু লাটাই ধরে আছে আর মনে মনে হেসে কুটি কুটি হয়ে উপচে পড়ছে।
সবাই নয়নকে খুব সাবাশি দিচ্ছে। বিট্টুদার গর্ব একেবারে মাটিতে ছড়িয়ে ছত্রখান—অহঙ্কারী বলে তার পরাজয়ে অনেকেই খুব খুশী হয়েছে। এদিকে আবার এক বিপত্তি। পক্ষীরাজ কিছুতেই নিচে নামতে চাইছে না। সারা আকাশ সে নিজের খেয়ালে উড়ে বেড়ায়। ওদিকে নয়নকে বিজয়ী ঘোষনা করা হয়ে গিয়েছে। প্রাইজ বিতরন শুরু হয় হয়। কিন্তু পক্ষীরাজের নামার কোন লক্ষন নেই। শেষে নয়ন অনেক ধমক ধামক দিতে তবে সে নামে।
রাত্রে নয়ন মাথার কাছে নিয়ে শুয়েছে পক্ষীরাজকে। বাড়িতে আজ কেউ ঘুড়ি নিয়ে নয়ন কে বকা ঝকা করছে না। বরং প্রাইজ বিতরনের সময় ছোটকাকে সে বেশ খুশী খুশী দেখেছে।
মাঝরাতে নয়নের ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয় পাখির মতো ফড় ফড় করে কি উড়ে বেড়ায় ঘরে। সাহসে ভর করে দুচোখ খুলতে তার মনে হয় যেন চোখ ধাঁধিয়ে যাবে—সারা ঘর ময় রামধনুর মতো এতো আলো। আরে ঘর কোথায়! ছাদ কোথায়? সব খোলা মেলা আকাশ হয়ে গিয়েছে, সেই চারদিক খোলা আলোর সমুদ্রে পক্ষীরাজ উড়ে বেড়াচ্ছে, উড়তে উড়তে পাখির মতো অনেক দূরে চলে যায়। নয়ন কিছু বলতে যায় কিন্তু তার গলা বুজে আসে! অবাক হয়ে সে শুধু তাকিয়ে থাকে।
~সমাপ্ত~
No comments:
Post a Comment